দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

জ্বালানির আকাশছোঁয়া দাম কমাতে এবার রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে চুক্তি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অথচ কয়েক সপ্তাহ আগেই রাশিয়ার তেল ও গ্যাস রপ্তানি থেকে আয় কমাতে নতুন নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক আরোপের আইন সই করেছিলেন তিনি। এবার পুতিনের সম্মতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ববাজারে রাশিয়ার ডিজেল সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছেন ট্রাম্প। ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে রিপাবলিকানদের ওপর রাজনৈতিক চাপের মধ্যেই এ সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি।
ট্রাম্প জানিয়েছেন, পুতিনের সঙ্গে আলোচনার পর রাশিয়া অবিলম্বে যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ববাজারে ৩ লাখ টনের বেশি ডিজেল সরবরাহ করবে। আগামী নভেম্বরে আরও ৫ লাখ টন এবং এর পরপরই আরও ১০ লাখ টন ডিজেল সরবরাহের কথা জানিয়েছেন তিনি। পরবর্তী সময়ে সরবরাহের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলেও দাবি করেছেন ট্রাম্প। তবে রাশিয়ার শোধনাগারগুলোর অবস্থার ওপর অতিরিক্ত সরবরাহ নির্ভর করবে।
যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। ডিজেলের বাড়তি দাম কৃষিকাজ, পণ্য পরিবহন ও অন্যান্য খাতেও প্রভাব ফেলছে। এতে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ার পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবে চাপে পড়েছে ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টি। আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে দলটির জন্য জ্বালানির দাম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে আইওয়া, কানসাস, টেক্সাস ও ওহাইওর মতো কৃষিনির্ভর অঙ্গরাজ্যে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বেশি। কৃষিকাজের যন্ত্রপাতি চালানো এবং উৎপাদিত পণ্য বাজারে নিতে এসব অঞ্চলে ডিজেলের ওপর ব্যাপক নির্ভরতা রয়েছে। ফলে জ্বালানির দাম কমানোর বিষয়টি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উভয় দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে এর আগে ইউরোপীয় মিত্রদের তেলের জরুরি মজুত থেকে আরও জ্বালানি বাজারে ছাড়ার জন্য চাপ দিয়েছেন ট্রাম্প। পাশাপাশি কৃষিকাজে ব্যবহারের জন্য করমুক্ত নির্দিষ্ট ধরনের ডিজেল আন্তরাজ্য পণ্য পরিবহনের ট্রাকে ব্যবহারের সুযোগও বাড়িয়েছেন তিনি। তবে এসব উদ্যোগের পরও জ্বালানির দাম নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি।
রাশিয়ার সঙ্গে নতুন চুক্তির ঘোষণা ট্রাম্পের আগের নীতির সঙ্গে বড় ধরনের বৈপরীত্য তৈরি করেছে। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধের কারণে মস্কোর জ্বালানি আয় সীমিত করতে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। গত মাসেও রাশিয়ার জ্বালানি খাতের আয় কমানোর লক্ষ্যে নতুন নিষেধাজ্ঞার আইন সই করেন ট্রাম্প। এখন সেই রাশিয়ার কাছ থেকেই ডিজেল আমদানির উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি।
চুক্তির ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় রাশিয়ার ডিজেল সরবরাহের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে সাময়িক অনুমতিও দিয়েছে। তবে জ্বালানির মূল্য পরিশোধ কীভাবে হবে, সরবরাহ কখন বাজারে পৌঁছাবে এবং চুক্তির অন্য কোনো শর্ত রয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
এদিকে চুক্তির সমালোচনা করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তার মতে, এই সিদ্ধান্ত রাশিয়ার জন্য উপহারস্বরূপ এবং এর মাধ্যমে মস্কোর যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা বাড়তে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, রাশিয়া এই সুযোগের প্রতিদান আরও সন্ত্রাস ও বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে দেবে। তার ভাষ্য, রাশিয়াকে জ্বালানিপণ্য বিক্রির সুযোগ দেওয়া এমন একটি যুদ্ধে বিনিয়োগের শামিল, যে যুদ্ধ শেষ হওয়া প্রয়োজন, দীর্ঘায়িত নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন আইনপ্রণেতাও এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। তাদের মতে, রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করার পরিবর্তে তা শিথিল করলে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনায় মস্কো আর্থিক সুবিধা পেতে পারে।
তবে রাশিয়ার ডিজেল সরবরাহ বাড়লেই যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম দীর্ঘমেয়াদে কমবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববাজারে ডিজেলের সরবরাহে ঘাটতি থাকায় এই চুক্তির প্রভাব সীমিত হতে পারে। রাশিয়ার শোধনাগারগুলো ইউক্রেনের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশটির ডিজেল উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতাও চাপে রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ডিজেল ব্যবহৃত হয়। ফলে প্রাথমিকভাবে ৩ লাখ টনের বেশি ডিজেল সরবরাহের ঘোষণা বাজারে কিছুটা স্বস্তি আনলেও তা দীর্ঘস্থায়ী মূল্যহ্রাস নিশ্চিত করবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। চুক্তির ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের ভবিষ্যৎ বাজারদর কমেছে, তবে খুচরা পর্যায়ে এর প্রভাব কতটা পড়বে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের, বিশেষ করে কৃষক, খামারমালিক ও ট্রাকচালকদের জন্য জ্বালানির দাম কমানো তার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। কিন্তু গত কয়েক মাসে জ্বালানি ও ভোগ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি তার প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়িয়েছে।
/অ